ঢাকা, রোববার   ১৬ মে ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ১ ১৪২৮

আইনের প্রবেশদ্বারের সামনে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৩০, ১ মে ২০২১  

অনলাইন ছবি

অনলাইন ছবি

আইনের প্রবেশদ্বারের সামনে বসে ছিল একজন দ্বাররক্ষী। গ্রাম থেকে আসা  এক লোক এসে তার কাছে এসে ভেতরে প্রবেশ করতে  চাইল। কিন্তু দ্বাররক্ষী জানালো যে, এই মুহূর্তে সে তাকে প্রবেশ করতে দিতে পারবে না। লোকটি একটু চিন্তা করে জানতে চাইল যে, পরবর্তীতে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে কিনা। “হ্যাঁ, যাবে,” দ্বাররক্ষী জানাল, ‘‘তবে এখন যাবে না।’’

কথোপকথনের সময়েও প্রবেশপথটি  খোলা ছিল। দ্বাররক্ষী একটু পাশে সরে গেলে লোকটি নিচু হয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করল। দ্বাররক্ষী বিষয়টা খেয়াল করে হাসতে হাসতে তাকে বলল, ‘‘তোমার যদি দেখার এতই ইচ্ছে হয়ে থাকে, তাহলে আমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে পার। কিন্তু মনে রেখ যে, আমি খুবই শক্তিশালী।  তবে দ্বাররক্ষীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কম ক্ষমতাধর। এই ফটক অতিক্রম করার পর এক জায়গা  হতে অন্য জায়গায় যেতে তোমাকে আরও অনেকগুলো দ্বার পার হয়ে যেতে  হবে। সেগুলোর প্রতিটাতেই দ্বাররক্ষী আছে, যে আগের জনের চেয়ে বেশী  শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর। এমনকি তাদের চোখের  দৃষ্টিকে  সহ্য করার ক্ষমতাও আমার নেই।’’

গ্রামের লোকটি এই ধরণের একটা জটিল  সমস্যায় পড়বে বলে ভাবেনি। সে ভেবেছিল যে, আইনের প্রবেশপথ  সবার জন্যেই খোলা থাকে। কিন্তু এখানে আসার পর সে নিবিড়ভাবে দ্বাররক্ষীর ফারের তৈরি কোট, খাঁড়া নাক এবং  দীর্ঘ কাল তাতার শ্মশ্রুর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাবার পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করাই তার জন্যে মঙ্গলজনক হবে।

দ্বাররক্ষী প্রবেশদ্বারের  সামনে লোকটিকে বসার জন্যে একটি টুল দিল। টুলের উপরে সে দিনের পর দিন, এমনকি বছরের পর  বছর কাটিয়ে দিল। ভেতরে প্রবেশের জন্যে আবারও  সে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করল। এমনকি দ্বাররক্ষীকেও বারংবার অনুরোধ করল। দ্বাররক্ষী প্রায়ই তাকে তার বাসস্থান ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন করলেও সেগুলো গতানুগতিক ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছাড়া কিছুই ছিল না। কারণ, সকল সময়েই সে লোকটিকে শেষ পর্যন্ত জানাতো যে, তার পক্ষে প্রবেশাধিকার দেয়ার সময় তখনও হয়নি।

লোকটি যা কিছু সাথে করে নিয়ে এসেছিল–মূল্যবান বা মূল্যহীন, তার সবগুলো বিক্রি করে দ্বাররক্ষীর মন জয় করার চেষ্টা করল। প্রতিটা সময়েই দ্বাররক্ষী তার দেয়া উপহারগুলো গ্রহণ করে  বলত, ‘‘আমি জিনিসগুলো তোমার কাছ থেকে এজন্যে নিচ্ছি, যাতে তোমার মনে না হয় যে, তুমি তোমার চেষ্টায় কোন  ত্রুটি করেছ।’’

এভাবে অনেক বছর পর্যন্ত লোকটি দ্বাররক্ষীকে ক্রমাগতভাবে তুষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে গেল। একসময়ে সে প্রবেশদ্বারের ভেতরের অন্য সকল দ্বাররক্ষীদের কথা ভুলে গেল এবং এই দ্বাররক্ষীকেই শুধুমাত্র তার আইনের ভেতরে প্রবেশের অন্তরায় বলে মনে করতে লাগল। প্রথমদিকের বছরগুলোতে সে চিৎকার করে  নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিশাপ দিত। কিন্তু বুড়ো হয়ে যাবার পর সে শুধু নিজের সাথে বিড়বিড় করত। আস্তে আস্তে একসময়ে  সে ছেলেমি আচরণ করা শুরু করে দিল। যেহেতু অনেক বছর যাবত সে দ্বাররক্ষীর সাথে তার প্রতিনিয়ত দেখা হচ্ছিল, দ্বাররক্ষীর জামার কলারের মাছিগুলোর সাথেও সে পরিচিত হয়ে উঠেছিলো, সেহেতু মাছিগুলোকেও সে অনুরোধ করত যাতে তারা তার পক্ষ হয়ে দ্বাররক্ষীকে অনুরোধ করত।

অবশেষে এক সময়ে তার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসল। সে আর বুঝতে পারছিল  না যে, তার চারপাশে আসলেই অন্ধকার, নাকি সে চোখে ভুল দেখছিল । তবে শেষদিকে অন্ধকারের ভেতরে সে এক ধরণের  অনির্বাণ আলোক শিখা দেখতে পাচ্ছিল, যে  আলোক শিখা আইনের প্রবেশদ্বার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে তার কাছে আসার চেষ্টা করছিল।

তার জীবন আর বেশীদিন অবশিষ্ট ছিল না। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে সে মাথার ভেতরে তার সারাজীবনের সকল অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে দ্বাররক্ষীকে একটা প্রশ্ন করার জন্যে মনঃস্থির করল। এই প্রশ্ন সে কখনই তাকে করেনি। ইশারা দিয়ে সে দ্বাররক্ষীকে কাছে ডাকল। কারণ অবশ হয়ে যাওয়া শরীরকে উত্তোলনের সামর্থ্য তার ছিল না।

দ্বাররক্ষীকে নিচু হয়ে তার সাথে কথা বলতে হল। কারণ লোকটি আসলেই অক্ষম হয়ে গিয়েছিল। “তুমি এখনও কি কিছু জানতে চাও?” দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করল। “তুমি দেখি আসলেই একজন অতৃপ্ত ধরণের মানুষ।”

“সবাই আইনের আশ্রয় লাভ করতে চায়,” লোকটি বলল।“ তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, আমি ছাড়া আর কেউই এই ফটকে এসে আজ পর্যন্ত  আইনে প্রবেশাধিকার চায়নি?”

দ্বাররক্ষী দেখল যে, লোকটার মৃত্যুর সময় প্রায় উপস্থিত। তার শ্রবণশক্তি দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং সে চিৎকার করে তাকে বলল, ‘‘এই প্রবেশ দরজা দিয়ে অন্যকেউ প্রবেশ করতে আসবে না। কারণ, এই প্রবেশদ্বারটি শুধুমাত্র তোমার জন্যে নির্ধারিত ছিল। আমি এখন এটাকে চিরতরে বন্ধ করে দিচ্ছি।’’

সর্বশেষ
জনপ্রিয়