ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৫ আগস্ট ২০২১ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৮

কবি সুফিয়া কামালের কবিতা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৩৯, ২৩ জুন ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

কবি সুফিয়া কামাল, বাংলার শ্যামল সুন্দর ভূমিতে অজস্র পঙক্তি বুনেছেন দৃঢ়তায়, সুরের বলিষ্ঠ মুগ্ধতায়।
‘মুক্তি লভে বন্দী আত্মা―সুন্দরে স্বপ্নে, আয়োজনে,
নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক, পুষ্প বিকাশের প্রয়োজনে।’
সাঁজের মায়া, কাব্যগ্রন্থ―সাঁঝের মায়া

এ কবিতাটিতেই অনুমান করা যায়, তাঁর কবিতার সম্ভাব্য গন্তব্য। কবিতার শরীরজুড়ে আত্মাকে তিনি মুক্তি দিতে চেয়েছেন অন্ধকার শৃঙ্খল হতে। নিজের আত্মবলিদানের মধ্যে সুন্দর ও মানুষের মুক্তির অমিয়ধারাকে স্পষ্ট করেছেন।
বাংলা কবিতার আধুনিকতার শুরু কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তা পরিপুষ্ট হয়। সামাজিক জীবন-বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে কবিতার ভাষা বদল হয়। বদল হয় কবিতার গঠনশৈলী। ত্রিশের দশকে রবীন্দ্রনাথের গণ্ডির বাইরে পঞ্চপাণ্ডব (অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত) বাংলা আধুনিক কবিতার আলাদা সুর নির্মাণ করেছেন।

সুফিয়া কামালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁজের মায়া’ প্রকাশ হয় ১৯৩৭ সালে। রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে এসে (সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত বলা যাবে না) তাঁর ব্যক্তিজীবনের উপলব্ধিতেই কাব্যগ্রন্থটিতে তিনি নিজস্ব ঢং তৈরি করেছেন। সুনিপুণ চিত্রকল্প, ব্যক্তি প্রতিনিধিত্ব ভাবের বিস্তৃতির আভাস, চেতনার মুক্তি সব মিলিয়ে তার কবিতা বাংলা কবিতার আধুনিক যাত্রাকে সর্মথন করে।
কবিতায় সত্য চিরকালীন। কবিতা গঠনশৈলী ও ভাষায় ভাবের চেতনা প্রকাশের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আধুনিক কবিতায় অনেক সময়েই প্রচলিত গঠন শৈলীকে কবি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন বা করছেন। কেননা কবিতার ভাব প্রকাশে ভাষার যে দ্যোতনা তৈরি হয় যা আক্ষরিক অর্থে কোনো ছন্দে আবদ্ধ থাকে না। যা নির্মোহভাবে পাঠককে সত্যের দিকে নিয়ে যায়। বর্তমান প্রচলিত গদ্যকবিতার ক্ষেত্রে তা দেখা যায়। যদিও কবি সুফিয়া কামালের বেশিরভাগ কবিতাই ছন্দের বিবেচনায় মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। যদিও এ আলোচনায় তার কবিতাকে ছন্দের কোনো ছকে ব্যবচ্ছেদ করা আমার উদ্যেশ্য নয়। আধুনিকতা বিশ্লেষণে কবির ভাষা, চেতনা ও ভাবের বিকাশ বিশ্লেষণই আমার কাছে গূরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

সুফিয়া কামালের কবিতা ধীর অথচ কী আশ্চর্য রকম তীক্ষ্ণ। তিনি তার চিন্তার জগৎকে বিস্তৃত করে, সচেতনভাবে প্রবহমাণ শব্দের গাঁথুনিতে কবিতা নির্মাণ করেছেন। নতুনকে স্বাগত জানিয়েছেন চিরকাল, ব্যর্থতাও তাকে পিছনে তাকাতে বাধ্য করতে পারেনি, তিনি লিখেছেন―

সে নহে পুষ্পের মৃত্যু, নতুনের স্পর্শ জাগানিয়া,
রঙ্গনের প্রীত হাস্যে জাগায়ে তুলিতে চাহে হিয়া।
সুকোমল আনন্দ উজ্জ্বল,
ব্যর্থতার এ তপস্যা হয় যদি হোক্ সে নিষ্ফল―
তবু সে পুষ্পল।
অনাগত, কাব্যগ্রন্থ-মায়া কাজাল

তিনি মন মননের সংকীর্ণতার বাইরে আসতে চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো হতাশার ভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন সৃষ্টির সেরা মানুষের কর্মকাণ্ডে, বঙ্গ করে উচ্চারণ করেছেন―

এতো হিংসা এতো দ্বেষ! এতো ক্রুর, এতো স্বার্থপর
করিয়া সৃজিলে তুমি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরে ঈশ্বর!
পশু―সেতো পশু! তবু সহজাত সংস্কার মায়ায়
রেখেছো সুন্দর করি। মানুষের ভঙ্গুর কায়ায়
ভরিয়া দিয়েছো যত গ্লানি পাপ তাপ।
একি অভিশাপ!
পৃথিবীর পথ, কাব্যগ্রন্থ-সাঁঝের মায়া

কবির মধ্যে আছে অনন্ত মুক্ত এক মায়াময় বিষাদ, রসের দীপ্ত চরণে তিনি বারবার মুগ্ধ করেন। প্রকৃতিকে দেখেন আত্মনিমগ্ন অপার সৌন্দর্য নিয়ে। যা কবিতায় ধরা দেয় নান্দনিক শব্দে। তার প্রকৃতি প্রেম বিষাদের আকুলতা, অভিমান, দুঃখ আনন্দ হয়ে ওঠে সকলের। যেমন―
‘হে কবি ! নীরব কেন―ফাগুন যে এসেছে ধরায়;
বসন্ত বরিয়া তুমি লবে নাকি তব বন্দনায়?’
……………
‘কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী―
গিয়েছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনোমতে।’
তাহারেই পড়ে মনে, কাব্যগ্রন্থ―সাঁঝের মায়া

যত হাসি, যত গান, যত রূপ―যত কিছু আলো।
লভিয়া পরশ তব আমার ভুবন হলো সুন্দর মধুর,
অপূর্ব এ আনন্দ, বিধুর।
বসন্তলিপি, কাব্যগ্রন্থ―মায়া কাজাল

দেশভাগ, কবির ঢাকার জীবন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের নিরীহ মানুষের ওপর শোষণ, বাংলা শিল্প সাহিত্য ধ্বংসের প্রয়াস, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি প্রেক্ষাপট তার ভাষাকে তার কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছিলো। রাজনৈতিক সচেতন কবি বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। ঘটনাপ্রবাহ তার কবিতায় প্রভাব ফেলেছে নিশ্চিতভাবে। তিনি প্রতিনিয়ত কবিতার শব্দকে ভেঙেছেন। নিজের চেতনাকে ব্যাপ্ত করেছেন মানুষের মধ্যে, জীবনের মানে খুঁজেছেন বৃহতের কণ্ঠস্বরে। যেমন―
আমার দিগন্ত নহে শূন্য শুধু, নহে মিথ্যা মায়া
নহে শুধু ছায়া―
নহে সে তো রিক্ত সর্বহারা,
দিগন্ত, কাব্যগ্রন্থ―মন ও জীবন

তার ব্যক্তিজীবন হয়ে যায় সমগ্র জাতির, তিনি মুক্তি খোঁজেন অন্ধকার হতে বের হওয়া। ঊনসত্তুরে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন কবিতায়। স্বপ্ন বোনেন পথ চিনে নেওয়ার। যে ইঙ্গিত স্বাধীনতার দিকেই ধাবিত হয়। তিনি লিখেছেন―
……………
জনতার সমুদ্রে জাগে ঢেউ
……………
এবার জেগেছে এই দেশ
……………
আত্মচেতনার রঙে মেলি শতদল,
বিথারি উঠেছে এতোদিনে,
এইবার পথ নিবে চিনে।
ঊনসত্তুরের এই দিনে, কাব্যগ্রন্থ―মোর যাদুদের সমাধি ’পরে

মোর যাদুদের সমাধি’ পরে এ বইটিতে বাতাসে বারুদ, মিছিল সারি সারি, মোর যাদুদের সমাধি ’পরে এমন আরো কবিতা আছে যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তঝরা দিনগুলোর সাক্ষ্য বহন করে।
তিনি প্রবাস থেকেও পবিত্র মাটির ঘ্রাণ পান। বিভোর হন শ্যামল বাংলার রূপে। তিনি লিখেন―কর্ণফুলির কল্লোল শুনি
মেঘনা পারের গান,
……………
বুঝি মনে পড়ে সুদূরের
শ্যামল মাটির মায়া―
যেথা হতে আনে তটিনী নটিনী
সবুজ দেহের ছায়া।
কর্ণফুলির কল্লোল শুনি, কাব্যগ্রন্থ-মৃত্তিকার ঘ্রাণ

কবি সুফিয়া কামালের কণ্ঠ ছিলো মাটিসংলগ্ন, ব্যক্তিজীবনের পীড়িত দ্বন্দ্বকে, মন ও জীবনের সংঘাতকে, নির্জন নিঃসর্গকে, জাতীয় জীবনের আশা নিরাশাকে নান্দনিকভাবে কবিতায় তুলে এনেছেন সুন্দর দৃঢ় শব্দ চয়নে প্রগতিশীল ভাবের ওপর ভর করে। তাঁর কবিতার ভাব মৃদু কিন্তু ব্যাপ্তি গণমানুষের মধ্যে, যাপিত জীবনের ধারায়, দেশপ্রেমের উজ্জ্বল অক্ষরে। হয়তো মহাকাল হিসাব রাখবে বাংলা কবিতায় কে মহান কবি বা প্রকৃত কবিসত্তা। কিন্তু সুফিয়া কামালের কবিতা মুক্ত চেতনার ওপর ভর করে আজো আমাদের প্রাসঙ্গিক। ১১০তম জন্মজয়ন্তীতে কবির প্রতি শ্রদ্ধা।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়