ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৫ আগস্ট ২০২১ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৮

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৫৯, ১৯ জুন ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সাত দিন জ্বরে ভুগছেন এহসান আহমেদ।

এত অষুধ, এত ডাক্তার, কোনো কাজ হচ্ছে না। জ্বরটা শরীর থেকে যাচ্ছে না। মুখ তিক্ত লালায় ভরে থাকে সারাক্ষণ। বিছানা থেকে নেমে এহসান আহমেদ বারান্দায় যান। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই এহসানের মন ও চোখে এক ধরনের রিলিফ অনুভব করেন। কারণ, বাসাটা এগারোতলা ফ্লাটের আটতলায়। বারান্দা থেকে পুরোটা আকাশ দেখতে পান তিনি। সেই আকাশ ঘনকৃষ্ণবর্ণের কালো হোক, রেহনুমার শাড়ির সবুজ রঙের হোক আর কাশবনের মতো সাদা হোক, তিনি মুগ্ধ চোখে দেখেন আকাশ।

মুখের তিক্ত থুতু ফেলার জন্য বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে অবাক এহসান আহমেদ। কি দেখছেন তিনি? নিজের চোখের দৃষ্টিতে কি দেখছেন বলতে পারছেন না কিন্তু দেখছেন। দূরে, অনেক দূরে আকাশে উড়ছে হাজার হাজার ছাইরঙের চিল। উড়তে উড়তে চিলগুলো বাসার খুব কাছে উড়ে আসে। কাছে আসার পর এহসান দেখতে পেলেন, চিলগুলোর শরীরে কেনো পালক নেই। নেংটা চিল। চিলগুলোর শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়ছে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। অবাক দৃষ্টিতে ওইসব দেখতে দেখতে এহসান অনুভব করলেন, আমার চোখ বেয়েও রক্ত নামছে ফোঁটায় ফোঁটায়। তিনি চোখের নিচে হাত দিলেন, ভেজা...। রক্ত নামছে! তেল চিটচিটে রক্ত। এক ধরনের মিষ্টি গন্ধও পাচ্ছেন তিনি। মুখে দিলেন রক্ত, মধুর স্বাধ রক্তের। চোখের কোল বেয়ে নেমে আসা রক্ত নামছে ঠোঁটে, মুখে, জিহ্বায়, গলায়, পেটে। এহসান আহমেদ নিজের রক্ত নিজের পেটেই ধারণ ধরছেন। এহসান দেখছেন আর ভাবছেন কেন দেখছি? কি দেখছি আমি? এই দেখার শেষ কোথায়?

নিচের দিকে শেয়ালদের হল্লাও চলছে! কচানদীর জলে কুমির আর হরিণের লড়াই চলছে, সবই দেখছেন এহসান আহমেদ ঢাকা শহরের এগারোতলা অ্যাপার্টমেন্টের আটতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। এমন হচ্ছে কেন? আমি কোনো জাদুর দেশে এসেছি? নাকি আমিই একজন জাদুকরে পরিণত হয়েছি? কিভাবে সম্ভব? আমি তো জ্বরে ভুগছি সাত আট দিন ধরে। আমার দেখার মধ্যে এতকিছু ঘটছে অথচ আমি একরত্তি ভয় পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক। সত্যিই কী চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একেবারেই স্বাভাবিক! অথচ মায়ের বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও ভয় পেতাম। মনে হতো কে যেন আসছে মাটি ফুঁড়ে, আমাকে নিয়ে যেতে আসমানের জলে! দেখতাম আসছে, আসছে..., আসছে... ধড়হীন, কানহীন, মুখহীন একটা সুন্দর মুখশ্রী। কপালের উপর টকটকে নীল টিপ। দাঁতাল দাঁতে পানের পিক... আমাকে গভীর আবেগে চুম্বন করতে আসে! ইশ কী শীতল কোমল চুম্বন, আমার শরীর, শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে চুম্বনের তরল শিসা। কাঁপছে লোমকূপ, কাঁপছে শিশ্ন। শরীরের কোষে কোষে ভয়ের সিডর তাণ্ডব নৃত্য।

এইসব রক্তের স্রোতধারায় ভাসতে ভাসতে এহসান দেখছেন, শত শত বাস ট্রাক ও রিকশার মধ্যে একটা লোক অনেক দূর থেকে উড়ে উড়ে আসছে। লোকটার কোনো পাখা নেই কিন্তু উড়ছে স্বাভাবিক গতিতে। না, লোকটার কোনো টাই নেই, প্যান্ট নেই, শার্ট নেই, নিচের দিকের লুঙ্গিটা পতপত পতাকার ঢংয়ে হাওয়াই শাড়ির মতো উড়ছে। উড়তে উড়তে বাস, ট্রাক, রিকশার উপর দিয়ে এহসান আহমেদের দিকে আাসছে...।

উড়তে উড়তে কাছে আসার পর এহসান আহমেদ দেখেন, উড়ে আসা লোকটির বাম পা নেই। উরুর কাছ থেকে বাম পা একেবারে করাত দিয়ে সমানভাবে কাটা। লোকটা উড়ছে প্রায় নিঃশব্দে। মনে হচ্ছে লোকটা হাজার হাজার বছর ধরে আকাশে আকাশে মৌমাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। লোকটার দুই হাত সামনে বাড়ানো। তাহলে কি দুই হাতের দোলায় উড়ছে লোকটা? বাতাসেরও আগে, শো শো বাতাসকে এক পায়ে পদাঘাতে পদাঘাতে জর্জরিত করে করে উড়ছে লোকটা? লোকটা আসছে, আসছে... খুব কাছে চলে আসছে। বারান্দা থেকে সরে যেতে চাইছেন এহসান আহমেদ কিন্তু পা সরছে না। মনে হচ্ছে পাজোড়া আটকে গেছে মেঝের সঙ্গে, কেউ নিচ থেকে গাম লাগিয়ে দিয়েছে।

রেহনুমা! এহসান আহমেদ চিৎকার দিয়ে ডাকছেন স্ত্রীকে। কই তুমি? এদিকে এসো...

কী হলো তোমার? দরজায় এসে দাঁড়ায় রেহনুমা। হাতে মাছ কাটার চকচকে বটি, মুখে বারবনিতাদের মাখা রক্ত লাল লিপস্টিক।

বারান্দায় আসার আগে রেহনুমা হাঁসের মাংস মেখে নীল পাকা আঙুর খাচ্ছিল, সেই রেহনুমার হাতে বঁটি এলো কোত্থেকে? আর ঠোঁটে বারবনিতার রক্ত লিপস্টিক! এহসান ভাবছেন, আমি কে? কোথায় এসেছি? আমার বাসায়? আমার সঙ্গের নারী কে? নাকি খাণ্ডবদাহনের ভূমিতে?

তুমি আমাকে ধরো, আমি ভয় পাচ্ছি। এহসান আহমেদ চিৎকার করেন।

কিন্তু রেহনুমা বঁটির ধারে জিহ্বার ধার পরীক্ষা করছে, আমি ব্যস্ত এখন। একটু পরই আমার নাচের অনুষ্ঠান শুরু হবে। তুমি যাবে না আমার নাচ দেখতে? আজকে আমার নাচ দেখতে মঙ্গোলিয়া মহান সম্রাট হালাকু খান আসবেন।

এহসান বুঝতে পারছেন না, আমার স্ত্রী রেহনুমা আখতার কবে নাচ শিখেছিল? রেহনুমা তো উঠোনে চারাপাতি খেলত মাত্র!

ওদিকে বাতাসের মুণ্ডুর উপর পা রেখে রেখে লোকটা আসছে, পদাঘাতে পদাঘাতে সব প্রাসাদ চূর্ণ বিচূর্ণ করে ইট পাথর খসিয়ে খসিয়ে আসছে। মুখ থেকে নেমে আসছে আদনান খাখোসিকে হত্যার রক্ত তরবারি। রেহনুমা আখতার বঁটি মেঝের উপর দাঁড় করিয়ে নাচতে শুরু করেছে, ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে...। অবাক বঁটির ধারের উপর নাচছে রেহনুমা আখতার কিন্তু একটু রক্তপাত হচ্ছে না। এহসান আহমেদের শরীর গুলিয়ে উঠছে, বমি আসছে। তিনি বমি করার জন্য জানালার শার্সি খুলতেই দেখতে পেলেন, লোকটা উড়তে উড়তে বাসার সামনে এসে থেমেছে, তাকিয়ে আছে শীতল দৃষ্টিতে এহসানের বারান্দায়, এহসানের দিকে। বাসাটা ঘিরে কয়েকবার চক্কর দিয়ে আমার থামে মুখোমুখি, লোকটা শীতল দৃষ্টিতে ফুটছে লাল পদ্ম। আর কাটা বাম পা থেকে নামছে পুঁজ, দুর্গন্ধে চারপাশটা পুড়ে যাচ্ছে দাউদাউ।

রেহনুমা আখতার নাচ থামিয়ে লিপস্টিক চর্চিত মুখে হাঁসের মাংস খাচ্ছে আর পটোলচেরা চোখে দেখছে বাতাসে ভাসমান কিম্ভুত লোকটাকে। অবাক ঘটনা, লোকটা চোখ টিপল রেহনুমা আখতারকে। রেহনুমা আখতার মিষ্টি হাসল। বলল আদুরে গলায়, আসতে এত দেরি করলে কেন জান?

গোসলে গিয়েছিলাম, তোমার কাছে আসব, পবিত্র হব না? কিন্তু কোথাও ক্ষমতামাখা একবাটি তাজা রক্ত পেলাম না। শেষে বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে গোসল করে এলাম। তাই, দেরি হলো...

রেহনুমা আ্খতার? শরীরের সকল শক্তি দিয়ে চিৎকাকরে ক্রোধ প্রকাশ করতে চাইলেন এহসান আহমেদ। তুমি ওকে চেনো?

হাঁসের মাংস খাওয়া শেষ করে রেহনুমা আখতারের হাতে সাদা তরমুজের ফালি, সাদা তরমুজের ফালি খেতে খেতে রসিক ঢংয়ে উত্তর দেয়, সেই কবে থেকে ওর সঙ্গে আমার...।

ভয়ে থরথর কাঁপছেন এহসান আহমেদ। তিনি অনুভব করতে পারছেন, এতদিন, বিবাহিত জীবনে কালসাপ পুষেছেন। এত আদর, এত আলিঙ্গন, এত খনন, এত শিৎকার, সবই সাপের সঙ্গে! তিনি বিব্রত নিজের উপর, আমি কে? আমিও সাপ? না কি সাপুড়ে? আমি খেলা দেখাই না আমি খেলা দেখি? লোকটা এসে গেছে ব্যালকনির বাইরে, একেবারে হাতের নাগালে। উড়ন্ত লোকটাকে দেখে রেহনুমা আখতার দৌড়ে আসে দরজা থেকে ব্যালকনিতে, শার্সির ফাঁক দিয়ে হাত বাড়ায় রেহনুমা আখতার, লোকটা বিকট বিকৃত মুখে ওর হাতে চুমু খায়। শার্সির ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে রেহনুমাকে জড়িয়ে ধরে, রেহনুমার মুখে লাল লিপস্টিক চর্চিত বারবনিতা হাসি, বাড়িয়ে দেয় বুক...।

একটু আদর করো, সোনা!

রেহনুমার খোলা বুকের উপর সুদৃশ্য মখমলের স্তনের ফোটা দাঁতাল দাঁতে ছিঁড়ে খাচ্ছে, ওমা! একবার স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নেয়, সঙ্গে সঙ্গে আবার খয়েরি বোঁটা গজিয়ে যায়। লোকটা আবার ছেঁড়ে, আবার চিবোয়...। উল্লাসে নাচে রেহনুমা!

উড়ন্ত লোকটাকে কেউ দেখছে না! পাশির বাড়ির ছাদে দুটি মেয়ে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট চুষছে পানির ট্যাংকের আড়ালে, ওরাও দেখছে না? বিপরীত দিকের বাড়ির বারান্দায় মাওলানা ছিপাড়া পড়াচ্ছেন নাবালিকাদের, সেও দেখতে পাচ্ছে না উড়ন্ত লোকটার সঙ্গে আমার স্ত্রী রেহনুমা আখতারের নগ্ন সময়ের কলাকৌশল? আমি কি করব? কি করা উচিত আমার? আচ্ছা, রেহনুমা আখতারের হাতে যে বঁটিটা ছিল, সেটা কই?

দূর আকাশে আবার দেখতে পায় এহসান চিলগুলো উড়ে উড়ে আসছে বিউগলের করুণ সুর বাজাতে বাজাতে। চিলের চিৎকারে উড়ন্ত লোকটা ফিরে দেখে আকাশজুড়ে চিলের আগ্রাসন। সঙ্গে সঙ্গে রেহনুমাকে ছেড়ে উড়ন্ত একপাঅলা লোকটা নিচে চলে যায়। আর রেহনুমা আখতারের কোলে একটা সবুজ কালারের বিড়াল এসে বসে। রেহনুমা আখতার বিড়ালের শরীরের উকুন বেছে দেয়, বিড়ালটা বিগৎ লম্বা জিহ্বা বের করে রেহনুমার মিহি গাল চাটে। চিলেরা চলে গেলে এক পাঅলা উড়ন্ত লোকটা দেয়াল বেয়ে বেয়ে তেলতেলে তেলাপোকার গতিতে উঠে আসছে আটতলার দিকে, ব্যালকনিতে। যেখানে দাঁড়িয়ে আমি এহসান আহমেদ।

আমি বুঝতে পারছি না, উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটা কী আমাকে মেরে ফেলবে? আমাকে কতজনে কতবার হত্যা করতে চেয়েছে, হিসাব নেই। বলা যায় আমি মৃত এক প্রাণী, নিজের মনে শ্লেটের উপর চকখড়িমাটি দিয়ে লিখছেন এহসান আহমেদ, আমাকে মারতে চেয়েছিল বড় ভাই, তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার অবৈধ সম্পর্ক আছে, এই সন্দেহে, কিন্তু আমি জানতাম আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বাড়ির কাজের লোকটার সঙ্গে। কতভাবে না ভাবিকে ব্যবহার করেছে মকবুল মুন্সি! দিনে রাতে...। ভাই চলে যেতেন গঞ্জে ধান মাড়াইয়ের কলে। এই শূন্যতার মধ্যে ভাবি লুৎফুর নাহার আর মকবুল মুন্সি...। ভুল অংকের শিকার আমি সব সময়ে, এহসান লিখে চলেছেন কালো শ্লেটের উপর কালো খড়িমাটি দিয়ে। আমাকে মারতে চেয়েছিল, অফিসের বড় সাহেব আবদুল হালিম, যখন হালিমের ফাইল আটকে দিয়েছিলাম মিথ্যা বাজেট বাড়ানোর সত্য অভিযোগে। আমাকে মেরে ফেলার জন্য খুনি নিযুক্ত করেছিলেন আবদুল হালিম, আমি পালিয়ে এসেছি চাকরি ছেড়ে। আমাকে খুন করতে চেয়েছিল খান সাহেব, ক্ষমতার চাকুতে, পাঁচ বছরের গ্লানি আর অপমানের পর আমি টিকে গেছি কোনোভাবে, মৃত মাটির গন্দম শোকে। সেই আমাকে আবার খুন করতে চাইছে উড়ন্ত একপাঅলা লোকটা? ভয়ে ভয়ে এহসান নিচে তাকান। দেখতে চান উড়ন্ত একপাঅলা লোকটার হাতে কোনো ছুরি বা চাকু আছে কি না!

এহসান আহমেদ নিচে তাকিয়েই দেখতে পান, চামড়া ছিলা চিলগুলো উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে, ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে ঠোকরাতে। লোকটা চিৎকার করছে। দুহাতে তাড়াতে চাইছে চিলগুলো কিন্তু চিলগুলোর সঙ্গে পেড়ে উঠছে না একপাঅলা উড়ন্ত লোকটা। লোকটাকে ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে ঠোকরাতে নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই বাতাসের ওপর তালি বাজাতে বাজাতে। উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটার আপাতত পতনে উল্লসিত এসহান, যাক শালা বেঁচে গেলাম। এখন শকুনদের জন্য একটা ভোজের আয়োজন করতে হবে। কোথায় করব, এহসানের ভাবনার মধ্যে রেহুনুমা জবাব দেয়, হোটেল আরশিনগরে করলে ভালো হবে।

এহসান আহমেদ দুহাতে তালি বাজাতে চাইলেন, হুরহে হুয়া কেয়া মজা! শেয়ালে খায় মামুর বাড়ির গরম গজা...। কিন্তু দুটি হাত পেরেক দিয়ে কেউ একজন গেঁথে দিয়েছে দেয়ালের গায়ে। অসহায় আক্রোশে চিৎকার করে ওঠেনÑকে? কে? কে? আমাকে গেঁথে দিয়েছে দেয়ালের সঙ্গে? কেন? কী আমার অপরাধ? কার প্রশ্ন কে দেবে উত্তর? না, এহসান আহমেদ উত্তর পাওয়ার জন্য কাউকে খুঁজে পেলেন না।

রেহনুমা আমাকে দেয়ালে গেঁথে রাখল? এহসান ভাবেন। না, তিনি কষ্ট নেন না। জানেন, প্রিয়জন, কাছের জনই তো হত্যার চাকু তৈরি রাখে বুকের ভেতরে।

দেয়ালে গাঁথা হাত দুটো নিয়ে এহসান আহমেদ তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, শূন্যতার যাত্রাপালায়। তাকিয়ে কী দেখছেন তিনি? দেখছেন রক্তের নিঃসঙ্গ স্রোতধারা, কাঁদছে আকাশ তিক্ত খেয়ালের সুরে। এইসব দেখতে দেখতে এহসান আহমেদ দেখেতে পান এক পাঅলা লোকটাকে ন্যাংটো চিলগুলো আকাশের পথে শূন্যে দোলাতে দোলাতে টুকরো টুকরো ছিঁড়ে খাচ্ছে, খেতে খেতে দুই এক টুকরো মাংস নিচে পড়ে যাচ্ছে সাৎ করে, এক পাঅলা লোকটা শূন্যে লাফাচ্ছে, কোকাচ্ছে, হাপাচ্ছে। এহসান আহমেদ এমন জীবন্ত বিভৎস চিত্রকল্প দেখে দেখে আনন্দে দিশাহারা হয়ে কাঁদছেন। মরি, মরি এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কজনার হয়? মনে পড়ে যায় এহসান আহমেদের, এক প্রবল ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে গিয়ে আম না কুড়িয়ে পাশের বাড়ির তাসলিমার সঙ্গে দোলনায় চড়ে দোলার দৃশ্য। চারদিকে উথাল পাতাল বাতাস, দিকবিদিক ভেঙে পড়ছে গাছের ডালপালা মড় মড় মড় শব্দে। কিন্তু আমগাছের ডালে বাঁধা দোলনায় ঝুলছেন তিনি আর তাসলিমা। বাতাতে বাতাসে আমেরা এসে লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের নিচে, তাসলিমার স্যালোয়ার কামিজ ভিজে এক সা, বুক চিতিয়ে উঠছে চরের মতো, জড়িয়ে ধরতে পেয়েছেন আকুল সুখ, সেই ঝড়ের দিনেই তাসলিমা বুক ধরতে দিয়েছিল, পরে আর সেই সুযোগ দেয়নি। তাসলিমা রহস্যনারীতে পরিণত হয়েছিল, ওকে কুকুরের লোভে পেছনে পেছনে ঘুরতে দেখলে মিটিমিটি হাসত তাসলিমা। আর অপমানে লজ্জায় মরমে মরে যেতে চাইতে এহসান। কিন্তু মরা আর হয়নি...

সেই মরার সময় কী এসে গেছে দুয়ারে কালো বিড়ালের নিঃশব্দ গতিতে! কি করবেন, না কি কিছু করবেন না, এইভাবে পেরেক গাঁথা হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন এহসান আহমেদ অনন্তকালের পথে? সিদ্ধান্তহীনতারকালে মনে হলো, দেয়াল থেকে হাতজোড়া মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু মুক্তি পাওয়া দুটো ফুটোসহ দুটি হাতে কিন্তু একটুও ব্যথা নেই। এহসান ফুটোসহ দুটো হাতের দিতে তাকিয়ে দেখছেন, মনে হচ্ছে হাতের ফুটোয় ফুটবে লাল গোলাপ!

এহসানের স্ত্রী রেহনুমা আখতার টকটকে লাল শাড়ি পরে পাশে দাঁড়িয়েছে গহিন দরজায়, ঘোমটা মাথায়। জিহ্বা বের হয়েছে দেড় হাত। ঘোমটার মধ্যে একটা শালিকের মুমুর্ষ বাচ্চা চিঁ চিঁ চিঁ ডাকছে। এহসান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, তাসলিমা না রেহনুমা আখতার? তাসলিমা? হ্যাঁ, আম কুড়ানো দিনের তাসলিমাই তো! এত বছর পর ধরা দিচ্ছে রক্তলোলুপ দিনে?

এহসান দেখো দেখো... রেহনুমা আখতার চিৎকার দেয়। এহসান আহমেদ স্ত্রীর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাকায় আকাশের গায়, যেখানে এক পাঅলা লোকটাকে টুকরো টুকরো করে খাচ্ছিল চামড়াছিলা চিলগুলো, সেইখানে, মাটির দিকে নেমে আসা টুকরো টুকরো মাংসগুলো জোড়া লাগছে বিন্দু বিন্দু উল্লাসে। জোড়া লাগতে লাগতে আবার একজন মানুষের আকৃতি পাচ্ছে। জোড়া লাগা অর্ধেক লোকটাকে ঠোঁটে ঠোঁটে খাবলে খাচ্ছে চামড়াছিলা চিলগুলো কিন্তু খেয়ে শেষ করতে পারছে না। ফলে টুকরো টুকরো মাংসগুলো ধীরে ধীরে একজন মানুষের আকার নিচ্ছে গোল গোল ফুটবলের আকৃতিতে। বিস্ফোরিত চোখে দেখেছেন এহসান। দেখছে রেহনুমা আখতার। কি দেখছে? কেন দেখছে? দেখার কি শেষ আছে মানবসংসারে? যেমন দেখাচ্ছে ট্রাম গণতন্ত্রের দেশে? দেখাচ্ছে ইসরায়েল পবিত্র বেথেলহেমে? যেমন দেখাচ্ছে ভারত কাশ্মিরে? মিয়ানমার দেখাচ্ছে প্রাচীর আরাকানে, রোসাং রাজদরবারের ভূমিপুত্রদের রক্তউৎসবে উৎখাত করে? দেখা ও দেখানোর কি শেষ আছে? দেখতে দেখতে জনাব এহসান দেখতে পান, জোড়া লেগে লেগে সেই মাংসপিণ্ডগুলো একজন আধা কালো আধা ফরসা মানুষের আকার নিয়েছে। মানুষটির বাম হাত অবশ। শরীরের সঙ্গে যুক্ত হাতটি রান্নাঘরের পাতির মোছার টুকরো টুকরো তেনার মতো ঝুলছে ঝুলছে...

এহসানের মুখে চুম্বন করে রেহনুমা আখতার, লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে না?

কামাতুর অশ্লীল চুমুতে সমুদ্র লবণের স্বাধ পান এহসান আহমেদ, না তো চিনতে পারছি না। কে লোকটা? দেখেছি কখনো?

হায় হারামজাদা, লোকটা তোমার সর্বনাশের তিথি!

মানে?

রেহনুমা আখতার ঠাস শব্দে চর মারে এহসান আহমদের গালে, শালা কাঁঠালের আমসত্ত! যে লোকটা তোমার জীবনটাকে দুমড়েমুচড়ে অপমানে ছাইয়ের পরিণত করল, সেই তিক্ত ফসিলকে চিনতে পারলে না! ক্রোধে উন্মত্ত রেহনুমা আখতার চলে যায় বারান্দা ছেড়ে, যাবার সময়ে নিয়ে যায় সমুদয় অক্সিজেন।

বারান্দায় অক্সিজেনহীন একলা এহসান কাতরাচ্ছেন অথৈজলের তোড়ে। ঠিক সেই সময়ে দেখতে পান তিনি, লোকটা চামড়াছিলা চিলগুলোর গ্রাস থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে মাটির দিকে নেমে আসছে সা সা...।

ধর ধর ধর... তারস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে রাস্তার দিক থেকে। কে কাকে ধরছে? এহসান আহমেদ তাকান রাস্তার দিকে। তিনি দেখতে পান, সেই লোকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছে রাস্তার ওপরে, দুই পা ও এক হাতে। এক হাত অবশ, লেগে আছে যক্ষ্মার তাবিজের মতো শরীরের সঙ্গে। অবাক কাণ্ড, লোকটার পিছে অজস্র লোক দৌড়ে আসছে পিঁপড়ার সারিতে। দুই পা ও এক হাতঅলা লোকটা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চলছে কিন্তু লোকগুলো দৌড়েও হারাতে পারছে না। মৃত্যুর আগে আগে যাচ্ছে লোকটা, এহসান আহমেদ দেখছেন আটতলার বারান্দা থেকে। কতদূর যাবে সে?

আটতলার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে এহসান দেখছেন প্রবল বিম্ময়ে লোকটার মাথাটা শরীর থেকে ছুটে যাচ্ছে ক্রিকেট বলের ছক্কার দ্রুততায়, ধড়সহ শরীরটা দৌড়াচ্ছে রাস্তার ওপর দিয়ে আইলার বিধ্বংসি গতিতে। মাথা? মাথা কোথায়? এহসান কিছু বুঝবার আগেই মাথাটা এসে কামড়ে ধরে মুখজোড়া বিকট দাঁতে, শুয়োরের বাচ্চা! আমার সঙ্গে ইতরামি করো? চেনো নাই আমারে? আমার সঙ্গে ইতরামি করার সাহস তোকে কে দিয়েছে? মনে নাই, পাঁচ বছর ইঁদুরেরর মতো চিঁচিঁ দৌড়েছিলি আমার পাছায় পাছায়?

চিৎকার করতে চান এহসান কিন্তু দাঁতাল লোকটার আক্রমণে দুই পাটি দাঁত ও ঠোঁট আটকে পড়েছে দুই পা ও এক হাতঅলা উড়ন্ত মুখ গহ্বরের বিকট আগ্রাসনের কবলে। গলার স্বরে গরগর আওয়াজ পান তিনি কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন না। মুখ এহসানের শরীরের রক্ত শুষে নেয়, শুনতে পাচ্ছেন ছুটে আসা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, মুণ্ডুটা খেয়ে যাচ্ছে এহসানের রক্ত, এহসানের লেখা, এহসানের স্বপ্ন, খেয়ে যাচ্ছে, খেতে খেতে এহসানের মাথাটা খেতে শুরু করে মড়মড় শব্দে।

এহসান আহমেদ বুঝতে পেরেছেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাশবিক দৃশ্য দেখার স্বাক্ষী রাখতে চায় না উড়ন্তু মুণ্ডু। মৃত্যু, করুণ মৃত্যু চলে এসেছে আর বেঁচে থাকবার কোনো সম্ভাবনা নেই, মৃত্যুর জন্য যখন তিনি প্রস্তুত ঠিক সেই সময়ে এহসান আহমেদ দেখতে পেলেন, চামড়া ছিলা চিলগুলো আবার ফিরে এসেছে উড়ন্ত মুণ্ডুর কাছে। দরজা জানালা ভেঙে ঢুকে পড়েছে ওরা ডানা পেটাতে পেটাতে। এবং মুখ দিয়ে ঠোকরাতে ঠোকরাতে নিয়ে যায় উড়ন্ত মুণ্ডুটা।

অন্যদিক থেকে চিলগুলো নিয়ে আসে উড়ন্ত মুণ্ডুটার ধড়। মুণ্ডু আর ধড় আকাশের মধ্যেই মিলে একজন মানুষের আকার নেয়। চমকে ওঠেন এহসান, আমার বুঝি মুক্তি নেই!

চামড়া ছেঁড়া চিলগুলোকে ফাঁকি দিয়ে উড়ন্ত কিম্ভূতকিমাকার দুই পা এক হাতঅলার সামনে আসে এবং এক লহমায় উড়িয়ে নিয়ে যায় খোলা আকাশের তা তা থৈ থৈ উঠোনে। আবার ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে শুরু করে দুই পা ও এক হাতঅলাকে, লোকটা দানবীয় চিৎকারে চামড়া ছিলা চিলদের মুখের গ্রাস থেকে নিচে পড়তে থাকে। ওর পিছুপিছু ছোটে নগ্ন কুৎসিত চিলগুলোও কিন্তু ধরার আগেই লোকটা বাস ট্রাক রিকশা লড়ির নিচে দই চিড়ার সুঁই আর সুতোয় ছিচড়ে ছিচড়ে যেতে থাকে চাকা আর ইট সিমেন্টের কর্কষ স্রোতে।

পিষে যেতে যেতে দুই পা এক হাতঅলা লোকটার মুখ থেকে বের হয়ে আসে, আমি খান সাব, আমি খান সাব, আমারে চেনো না? আমি খান....।

বাতাসে সব যন্ত্রণা আর শব্দ মিশে যায় বন্যার অথৈ জলে গুঁ আর লাশের যাত্রায়।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়