ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রাহায়ণ ১৯ ১৪২৮

ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮:৫৭, ১৫ অক্টোবর ২০২১  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

স্বাধীনতার পর দেশ গড়তে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, তার মধ্যে একটি ছিল ঘাঁপটি মেরে থাকা উগ্রবাদ। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারছিলেন যে, দেশের সরলপ্রাণ মানুষদের ধর্মের নামে কট্টপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। তাই তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এই দেশে, প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে ইসলাম ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক এই ফাউন্ডেশনই এখন সরকারি অর্থে পরিচালিত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ সংস্থা হিসেবে পরিচিত।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্যস্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না… এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’

স্বাধীনতার পর, প্রথমবারের মতো হজযাত্রীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু। একইসঙ্গে ইসলামি আকিদাভিত্তিক জীবন গঠন ও ইসলামি শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পুনর্গঠন করেন মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড। বঙ্গবন্ধুই প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে এর নাম রাখেন “বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড”। এছাড়াও, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে স্বাধীনতার পরেই হাইজি, জুয়া, মদ ও ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুই টঙ্গীতে প্রথম বিশ্ব ইজতেমার জন্য জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। একারণে আজও ইজতেমায় আগত লক্ষ লক্ষ মুসলিম টঙ্গীতে সমবেত হন এবং দাওয়াতি কাজ পরিচালনার জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঢাকার প্রধান কার্যালয়সহ সারা দেশের ৬৪টি জেলা কার্যালয় রয়েছে, আর্ত-মানবতার সেবায় রয়েছে ২৮টি ইসলামিক মিশন, এমনকি সাতটি ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির মাধ্যমে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বৃহত্তম কলেবরে ২৮ খণ্ডে ইসলামি বিশ্বকোষ, ১২ খণ্ডে সিরাত বিশ্বকোষ প্রকাশ করে ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অসামান্য অবদান রেখেছেন, তা পুরো মুসলিম বিশ্বে একটি দৃষ্টান্ত।

এই প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত পবিত্র কুরআনের বাংলা তরজমা, তাফসির, হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ, রাসূল (স.)-এর জীবন ও কর্মের ওপর রচিত ও অনূদিত গ্রন্থ, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামি আইন ও দর্শন, ইসলামি অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাহাবি ও মনীষীগণের জীবনী ইত্যাদি নানা বিষয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এসব গ্রন্থ শুধু বাংলাদেশের পাঠকদের কাছেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়ে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি, কল্যাণ ও মানবতার ধর্ম ইসলামের অপব্যাখ্যা করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকগোষ্ঠী, হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর-দালালেরা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামবিরোধী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অমুসলিম আখ্যা দেয়। তারা স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করে, চালায় নারী নির্যাতন। অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়; আর তথাকথিত ‘গনিমতের’ মাল হিসেবে লুট করে মুক্তিকামী মানুষের সম্পদ-সম্পত্তি। অথচ এসবই ছিল সম্পূর্ণ ইসলাম-বিরোধী, সম্পূর্ণ হারাম বা অবৈধ। মুক্তিযুদ্ধকালে ইসলামের তথাকথিত ধ্বজাধারীদের এহেন ঘৃণ্য অপকর্ম সবাইকে হতবাক ও স্তম্ভিত করে দেয়। ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তারা যেসব ঘৃণ্য অপকর্ম সংঘটিত করে এদেশের মাটিতে, তা পবিত্র ইসলামের শুভ ললাটে কালিমা লেপন করে দেয়। এই কালিমালিপ্ত ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই জাতির জনক ইসলাম প্রচার-প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অধ্যাদেশ বলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্টে এই প্রতিষ্ঠানের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় তা হচ্ছে-

(ক) মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমি ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা।

(খ) মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমি ও ইনস্টিটিউট এবং সমাজ সেবায় নিবেদিত সংগঠনসমূহকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।

(গ) সংস্কৃতি, চিন্তা, বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে ইসলামের অবদানের ওপর গবেষণা পরিচালনা।

(ঘ) ইসলামের মৌলিক আদর্শ বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, ন্যায় বিচার প্রভৃতি প্রচার করা ও প্রচারের কাজে সহায়তা করা এবং সাংস্কৃতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ এর সুপারিশ করা।

(ঙ) ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আয় ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণার আয়োজন করা ও তা প্রসার ঘটানো এবং জনপ্রিয় ইসলামি সাহিত্য সুলভে প্রকাশ করা এবং সেগুলির সুলভ প্রকাশনা ও বিলি-বণ্ঠনকে উৎসাহিত করা।

(চ) ইসলাম ও ইসলামের বিষয় সম্পর্কিত বই-পুস্তক, সাময়িকী ও প্রচার পুস্তিকা অনুবাদ করা, সংকলন করা ও প্রকাশ করা।

(ছ) ইসলামের ইতিহাস ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আয় ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিষয়াদির ওপর সম্মেলন, বক্তৃতা, বিতর্ক ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা।

(জ) ইসলামবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কার ও পদক প্রবর্তন করা।

(ঝ) ইসলাম সম্পর্কিত প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া, প্রকল্প গ্রহণ করা কিংবা তাতে সহায়তা করা।

(ঞ) ইসলামবিষয়ক গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান করা।

(ট) বায়তুল মুকারাম মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও উন্নতি সাধন করা।

(ঠ) উপরোক্ত কার্যাবলির যে কোনোটির ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক বা আপতিত সব কাজ সম্পাদন করা।

এছাড়াও, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুই সর্বপ্রথম আলেম-ওলামাদের সংগঠিত করে ইসলামের সঠিক রূপ জনগণের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় সীরাত মজলিশ নামে ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। সীরাত মজলিশ ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের রবিউল আউয়াল মাসে স্বাধীন বৃহত্তর আঙ্গিকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু বায়তুল মুকাররম মসজিদ চত্বরে মাহফিলের উদ্বোধন করেন। একজন সরকার প্রধান হিসেবে জাতীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিলের উদ্বোধন উপমাহাদেশের ইতিহাসে প্রথম দৃষ্টান্ত। এরই ধারাবাহিকাতায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতিবছর জাতীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা) মাহফিল উদযাপন হয়ে আসছে।

এমনকি ইসলামের ধর্মীয় দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশে ঈদে-মিলাদুন্নবী (স), শব-ই-কদর, শব-ই-বরাত উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। এই দিনগুলো ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার জন্য সিনেমা হলে চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ রাখার নির্দেশনাও প্রদান করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়