ঢাকা, রোববার   ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

চা উৎপাদনে ক্লোন চায়ের চারা দিয়ে চা বাগান তৈরি করা হচ্ছে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:২৯, ২৬ অক্টোবর ২০২২  

চা উৎপাদনে ক্লোন চায়ের চারা দিয়ে চা বাগান তৈরি করা হচ্ছে

চা উৎপাদনে ক্লোন চায়ের চারা দিয়ে চা বাগান তৈরি করা হচ্ছে

উচ্চফলনশীল, আকর্ষণীয় ও মানসম্পন্ন চা উৎপাদনে ক্লোন চায়ের চারা দিয়ে চা বাগান তৈরি করা হচ্ছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউশন (বিটিআরআই) চা শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে বিটি ২৩তম নতুন ক্লোন চা উদ্ভাবন করেছে। এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত ক্লোন চায়ের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৩ হাজার কেজির বেশি এবং সর্বোচ্চ রেকর্ড ফলন ৪-৫ হাজার কেজি। চা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্লোন গাছে রোগবালাই কম হয়।

চা গাছ একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ উদ্ভিদ। বাংলাদেশে চা শিল্পের বয়স ১৭৯ বছর। সুদীর্ঘ এ সময়ে দেশের মানচিত্র বদলেছে দুবার। তবে চা শিল্পের অগ্রযাত্রা থামেনি। অমিত সম্ভাবনার অনুপাতে অনেকটা অর্জিত না হলেও এই শিল্পের অর্জনও কিন্তু কম নয়। বিটিআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান চা শিল্পে জেনেটিক মডিফিকেশন ও মাইক্রোপোপাগেশনের মাধ্যমে চায়ের ক্লোন চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।

সাধারণ বীজের চারার চেয়ে ক্লোন চারা শীত ও খরা সহায়ক, রোগবালাই ও পোকামাকড় প্রতিরোধ এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ন্ত্রণসহ গুণগতমান সম্পন্ন। বাগানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চা শ্রমিক চা গাছ থেকে ক্লোন এনে বিশেষ পদ্ধতিতে চারা করেন। আর চারা পরিপক্ব হলেই চা বাগানে রোপণ করা হয়।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউশন (বিটিআরআই) সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ বীজের চেয়ে উন্নত মান ও ফলনের জন্য এ পর্যন্ত বিটিআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত ৪ ধরনের বাইক্লোনাল বীজস্টক যথা- বিটিএস-১, বিটিএস-২, বিটিএস-৩ এবং বিটিএস-৪ নামক বীজস্টক চা শিল্পে ছাড়া হচ্ছে। চায়ের উৎপাদন ও গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিটিআরআই বীজজাত উন্নয়নের পাশাপাশি ক্লোনাল সিলেকশন বা ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত নিজস্ব ১৭টি ক্লোনজাত অবমুক্ত করেছে।

বিটি-১, বিটি-২, বিটি-৩, বিটি-৫, বিটি-৭, বিটি-৯, বিটি-১১, বিটি-১৩ ও বিটি-১৪ ক্লোনগুলো আদর্শ ক্লোন হিসেবে পরিগণিত। বিটি-১০ ও বিটি-১২ ক্লোনদ্বয় উচ্চফলনশীল ক্লোন শ্রেণিভুক্ত। বিটি-৪, বিটি-৬ ও বিটি-১৫ উচ্চ পেয়ালিমানসম্পন্ন ক্লোন হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ চা বোর্ড আয়োজিত প্রথম জাতীয় চা দিবস-২০২১ উপলক্ষে উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশে উদ্ভাবিত উন্নতমানের চায়ের চারা বিটি-২২ ও বিটি-২৩। বিটিআরআই সূত্রে জানা আরো গেছে, চা শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে কেন্দ্রটি এর আগে ১৮টি ক্লোন চা উদ্ভাবন করে। এই ক্লোন চা উচ্চফলনশীল, আকর্ষণীয় ও গুণগত মানসম্পন্ন। এ ধারায় নতুন দুটি ক্লোন ১৯ ও ক্লোন ২০ যুক্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত ক্লোন চায়ের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৩ হাজার কেজির বেশি এবং সর্বোচ্চ রেকর্ড ফলন ৪-৫ হাজার কেজি। শীত ও খরা সহায়ক, স্বল্প সময়ে পাতা ও পরিপূর্ণ বুশ হওয়ার যোগ্য, রোগবালাই ও পোকামাকড় প্রতিরোধ এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ন্ত্রণসহ গুণগতমানসম্পন্ন চায়ের ক্লোন উৎপাদন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ক্লোন চারা তৈরির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চা শ্রমিকরা বলেন, বর্তমানে চায়ের বীজ থেকে কোনো চারা হয় না। বাগানের চা গাছ থেকে ক্লোন এনে বিশেষ পদ্ধতিতে চারা করেন। আর চারা পরিপক্ব হলেই চারা বাগানে লাগানো হয়। প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ক্লোন চারা রোপণ করা হয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ টি এসোসিয়েশন সিলেট শাখা চেয়ারম্যান, জি এম শিবল বলেন, সিডলিং চারা চেয়ে আমরা ক্লোন চারা বেশি ব্যবহার করছি। সিডলিং চারা দিয়ে যে উৎপাদন পেতাম, তার থেকে দ্বিগুণের চেয়ে বেশি উৎপাদন পাচ্ছি এই ক্লোন গাছ থেকে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, বিটিআরআই কয়েক বছর গবেষণার পর এসব ক্লোন আবিষ্কার করে। ক্লোন গাছ থেকে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ যেমন বাড়বে পাশাপাশি চায়ের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান মালিক মহসীন মিয়া বলেন, অধিক উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন উন্নত মানের চায়ের ক্লোন বিস্তার ও বাস্তবায়নে চা শিল্পের অগ্রগতি ও উন্নয়নে প্রবহমান অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। তার বাগানে ৮০ শতাংশ ক্লোন গাছ থাকায় উৎপাদন খরচ কমে গেছে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে গুণগতমান বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক। বর্তমান সময়ে বাগান মালিকরা ক্লোন চারার দিকে ঝুঁকছেন। তিনি আরো বলেন, প্রোডাকশন থেকে শুরু করে সব কিছুতে খরচ কমে যাওয়ার কারণে শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে।

এদিকে ২০২১ সালে বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানের ৬৫ হাজার হেক্টর জমি থেকে ৯৬ দশমিক ৫০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপন্ন হয়েছে, যা দেশের চা শিল্পের ১৬৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। চা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমাগত নগরায়ণের ফলে ও জনতার শহরমুখিতার কারণে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।

এছাড়া সামাজিক উন্নয়নের ফলে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। ফলে চায়ের রপ্তানি হঠাৎ করেই কমে গেছে। তারপরও জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী। জিডিপিতে চা খাতের অবদান ০ দশমিক ৮১ শতাংশ।

সারাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়